অধ্যায় ১: তৈমুরের বক্ররেখা
রৈথনপুর কোনো সাধারণ জনপদ নয়, বরং এটি ভৌগোলিক এক বিভ্রম। মানচিত্রে যে পথটিকে সরল মনে হয়, বাস্তবে তা কয়েকশ মনস্তাত্ত্বিক বাঁকের সমষ্টি। উত্তরবঙ্গের এই ভূখণ্ডে তৈমুর নদী যেন কোনো এক খামখেয়ালি শিল্পীর তুলি, যা প্রতি বর্ষায় নতুন নতুন চর আর গোপন বাঁক সৃষ্টি করে। সেই বাঁকের গোলকধাঁধা পেরোলেই রৈথনপুর গ্রাম।
গ্রামটির নিস্তব্ধতা কোনো শূন্যতা নয়, বরং তা সহস্রাব্দ ধরে জমে থাকা শব্দপুঞ্জের ভার। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জেমস জে গ্রসের সেই অমোঘ তত্ত্বটি এখানে ধ্রুবসত্যের মতো কাজ করে:
❝দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক নীরবতা উচ্চারিত শব্দকে বিলুপ্ত না করে পরিবেশের মধ্যে অবদমিত অবস্থায় ধরে রাখে।❞
এই গ্রাম আধুনিকতা ও আদিমতার এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একবিংশ শতাব্দীর কৃত্রিম আলো এখানে পৌঁছালেও, মাটির নিচের অন্ধকারটা এখনো মধ্যযুগীয়।
অধ্যায় ২: জ্যোৎস্নার বিষাদ
সিনু ছিল রৈথনপুরের এক অমীমাংসিত রহস্য। তার সৌন্দর্য ছিল এমন যা ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে শব্দরা থমকে দাঁড়ায়। শরৎকালের মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ যেমন স্নিগ্ধ অথচ শীতল, সিনু ছিল ঠিক তেমনই। তার গায়ের রঙ ছিল শ্বেতপাথরের মতো স্বচ্ছ, আর চোখ দুটোতে ছিল এক সমুদ্র পরিমাণ মায়ার আস্তরণ। তাকে দেখলে মনে হতো কোনো এক অলৌকিক চন্দ্রমানবী ভুল করে এই মর্ত্যের ধূলিকণায় নেমে এসেছে।
কিন্তু এই স্বর্গীয় সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক প্রলয়ঙ্কারী সত্তা। সিনু ছিল প্রচন্ড বদমেজাজী, তার রাগ ছিল তীব্র এসিডের মতো- যা মুহূর্তে সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করতে পারত। গ্রামের মানুষ তাকে দেবী মানত, আবার ডাইনির মতো ভয়ও পেত। সিনুর যত্ন নেওয়ার ধরণটিও ছিল বিচিত্র। সে যখন কারো সেবা করত, তখন তার চোখে মায়া থাকতো না, থাকতো এক ধরণের শীতল কর্তৃত্ব। তার হাতের স্পর্শে রোগ সেরে যেত ঠিকই, কিন্তু রোগী অনুভব করত এক অজানা শিহরণ। যেন সে তার মৃত্যুসজ্জায় দ্বিতীয়বার মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আরোগ্য লাভ করছে।
অধ্যায় ৩: নীলকুঠির অন্ধকার
গ্রামের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা নীলকুঠি এখন আর কেবল পুরনো ইট-কাঠের জঞ্জাল নয়। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রৈথনপুরের যুবকরা সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিল রহস্য উদ্ঘাটনের আশায়। কিন্তু লেন্সের ভেতরে যা ধরা পড়ল, তা কোনো মানুষের মস্তিষ্কের পক্ষে নেওয়া সম্ভব ছিল না।
সিনু যখন মারা গেল, তার দেহটি পাওয়া যায়নি। লোকে বলে সে নীলকুঠির অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু রহস্যের শুরু সেখানেই। আধুনিক থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরায় দেখা গেল, নীলকুঠির ভেতরে এক বিশাল শক্তির উৎস ঘোরাফেরা করছে, যার অবয়ব হুবহু সিনুর মতো। কিন্তু সেই অবয়বের কোনো শারীরিক অস্তিত্ব নেই। নেই সেই বাস্তবিক সিনুর চন্দ্রীয় স্নিগ্ধতা।
এক রাতে শহর থেকে আসা তরুণ এক ইউটিউবার তার ড্রোনের মাধ্যমে নীলকুঠির ওপর নজরদারি করছিল। হঠাৎ ড্রোনটির সিগন্যাল জ্যাম হয়ে গেল এবং স্ক্রিনে ফুটে উঠল সিনুর সেই মোহময়ী অথচ ভয়ংকর মুখ। সে হাসছে না, কাঁদছে না; শুধু অপলক তাকিয়ে আছে। তার সেই চন্দ্রময়ী রূপের আড়ালে এক দানবীয় আক্রোশ ফুটে উঠছে।
অধ্যায় ৪: অবদমিত শব্দ
রৈথনপুরের মানুষ বুঝতে শুরু করল, সিনু কেবল ভূত হয়ে ফেরেনি, সে ফিরেছে এক ধরণের 'মেটাসাইকোলজিক্যাল' শক্তি হিসেবে। সে গ্রামের প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা 'প্রাইভেসি' হ্যাক করে ফেলেছে। নীলকুঠির দেয়াল কান পাতলে এখন শোনা যায় মানুষের অবদমিত পাপের আধুনিক শব্দ।
সিনু আসলে ভিলেন ছিল না, বরং সে ছিল এই কলুষিত সমাজের এক নির্মম রিফ্লেকশন বা প্রতিফলন। সে তার রূপ আর রাগ দিয়ে মানুষকে আকর্ষণ করত কেবল তাদের আসল চেহারাটা সামনে আনার জন্য।
নীলকুঠির গভীর অন্ধকার কুয়োর ভেতরে এখন কোনো জল নেই, আছে কেবল হাজার হাজার মানুষের চোখের জল আর লুকানো অপরাধের ইতিহাস। সিনু সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে এক সম্রাজ্ঞীর মতো। সে জানে, এই আধুনিক সভ্যতার ডিজিটাল আলোর নিচেও মানুষের অন্ধকার কত গভীর। সে কেবল এক সার্থক সাক্ষী নয়, সে এই মহাকালের এক নিষ্ঠুর বিচারক।
অধ্যায় ৫: অবদমিত পিক্সেল
এক গভীর রাতে রৈথনপুরের এক যুবক তার স্মার্টফোনের অনবরত নোটিফিকেশনে সচকিত হয়ে উঠল। গ্যালারি খুলতেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে গেল। সেখানে সারি সারি এমন সব ছবি জমা হচ্ছে, যা সে কখনো তোলেনি, এমনকি কোনো ক্যামেরাতেও ধারণ করা সম্ভব নয়। সেগুলো কোনো সাধারণ ছবি নয়- বরং তার অবদমিত কামনার এক কুরুচিপূর্ণ এবং দৃশ্যমান প্রতিফলন; সেইসব আদিম আকাঙ্ক্ষা যা সে সমাজের ভয়ে নিজের মস্তিষ্কের সবচেয়ে অন্ধকার কুঠুরিতে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। তার এনক্রিপ্টেড পাসওয়ার্ডের দেয়াল ভেঙে সিনু যেন তার মনের ভেতরের নর্দমাটাকে স্ক্রিনে তুলে এনেছে।
আতঙ্কে যুবকটির দম বন্ধ হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই ঘরের কোণে সেই অতিপ্রাকৃত জ্যোৎস্নার ছটা দেখা দিল। সিনু আবির্ভূত হলো। কোনো বিকট শব্দ বা ভয়ংকর রূপ নিয়ে নয়, বরং তার সেই চন্দ্রময়ী মায়া আর অলৌকিক স্নিগ্ধতা নিয়ে সে স্থির হয়ে দাঁড়াল। যুবকটির হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল, তার মনে হলো শরীরটা এখনই পাথরের মতো ভার হয়ে ফেটে যাবে।
সিনু এগিয়ে এলো। তার চোখে কোনো ঘৃণা নেই, বরং এক ধরণের বিচারকের শীতলতা। সে তার বরফশীতল হাতটি যুবকটির কাঁপতে থাকা বুকের ওপর রাখল। মুহূর্তের মধ্যে যুবকটির শ্বাসকষ্ট দূর হয়ে গেল। সেই সাথে তার ফোন থেকে সমস্ত ডেটা অদৃশ্য হয়ে গেল। তার গোপন অর্জিত ভিডিও, আপত্তিকর ছবি, যতসব পাপকর্ম- সবই যেন এক লহমায় ধুলোয় মিশে গেল। সিনু তাকে বাঁচাল না, বরং তাকে তার নিজের ঘৃণিত সত্যের সামনে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়ে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো।