দূরত্বের মাঝেও কাছাকাছি
বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল শ্রাবণ। শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার মনটা যেন সেই মোড়েই আটকে রইল, যেখানে পৃথা দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ আগে।
এতদিন ধরে যে মানুষটিকে শুধু মেসেজ আর ফোনকলের মাধ্যমে চিনেছে, আজ তার সঙ্গে কাটানো কয়েক ঘণ্টা যেন মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল।
অন্যদিকে পৃথাও কিছুক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। বাসটা চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার পরও সে যেন নড়তে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা বলা বাকি থেকে গেছে।
হঠাৎ ফোনে একটি নোটিফিকেশন ভেসে উঠল।
শ্রাবণ: "ঠিকমতো পৌঁছেছ?"
পৃথার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল।
পৃথা: "হ্যাঁ। তুমি?"
শ্রাবণ: "হ্যাঁ, বাস চলছে।"
এরপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। যেন অনেক কথা আছে, অথচ কোনো কথাই খুঁজে পাচ্ছে না।
অবশেষে শ্রাবণ আবার লিখল—
শ্রাবণ: "আজকের দিনটা... মনে থাকবে সারাজীবন।"
পৃথা অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে লিখল—
পৃথা: "আমারও।"
বাস শহরের সীমানা ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল। কিন্তু দুজনের অনুভূতি যেন একই জায়গায় আটকে রইল।
অনুভূতির আড়ালে কিছু
বাসায় ফিরে এসেও শ্রাবণের মন স্থির হলো না। বারবার মনে হচ্ছিল, দিনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আবার ফিরে দেখতে পারলে ভালো হতো।
পৃথাও নিজের রুমে ফিরে অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব করছিল। সারাদিনের ক্লান্তির মাঝেও বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল শ্রাবণের হাসিমুখ।
রাতের দিকে আবার মেসেজ এল।
শ্রাবণ: "কী করছ?"
পৃথা: "কিছু না। একটু ক্লান্ত লাগছে।"
শ্রাবণ: "আজকের দিনটার জন্য ধন্যবাদ।"
পৃথা: "আমারও ভালো লেগেছে। তবে সময়টা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল।"
কিছুক্ষণ টাইপ করে আবার মুছে ফেলল শ্রাবণ। তারপর সাহস করে লিখল—
শ্রাবণ: "তোমার সঙ্গে কাটানো সময়গুলো... অন্যরকম লাগে।"
পৃথা উত্তর দিতে একটু সময় নিল।
পৃথা: "আমাদের বন্ধুত্বটাই অন্যরকম... তাই না?"
শ্রাবণ: "হ্যাঁ... একটু বেশিই অন্যরকম।"
পৃথা হয়তো কথাটার গভীরতা বুঝতে পারেনি। কিন্তু শ্রাবণ জানত, তার অনুভূতি আর শুধুই বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
পাহাড়ের কান্না
পরদিন অন্য ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা শেষে তারা আবার দেখা করল। আগের দিনের মতো আজও আকাশ মেঘে ঢাকা।
শ্রাবণ সঙ্গে করে একটি ছাতা এনেছিল।
দুজন শহরের কোলাহল ছেড়ে পাহাড়ের দিকে হাঁটতে লাগল। চারপাশে নীরবতা, দূরে সবুজ পাহাড়, আর মাঝে মাঝে ভেসে আসছে পাখির ডাক।
একটি ছোট্ট পুকুরের ধারে ফুটে থাকা বুনো হলুদ ফুল দেখে শ্রাবণ থেমে গেল।
সে আলতো করে একটি ফুল তুলে পৃথার কানের পাশে গুঁজে দিল।
পৃথা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না। শুধু মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।
ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে নেমে এল বৃষ্টি।
পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসা বৃষ্টির ধারা যেন প্রকৃতির নীরব কান্না।
বৃষ্টি কিছুটা কমলে তারা শহরের দিকে হাঁটা দিল।
হঠাৎ আবার বৃষ্টি শুরু হলো।
শ্রাবণ ছাতা খুলতে গেল।
পৃথা: "থাক... আজ না হয় ভিজেই যাই।"
দুজনেই শহরের রাস্তায় বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হাঁটল। চারপাশে মানুষ ছুটছে আশ্রয়ের খোঁজে, অথচ তাদের দুজনের যেন কোনো তাড়া নেই।
বিকেলের শেষে বিদায়ের সময় পৃথা নিজের হাত বাড়িয়ে দিল।
পৃথা: "আচ্ছা... ভালো থেকো।"
শ্রাবণ কিছুটা ইতস্তত করলেও শেষ পর্যন্ত হাত বাড়িয়ে দিল।
এটাই ছিল কোনো নারীর স্পর্শে তার জীবনের প্রথম অনুভূতি।
সেই মুহূর্তটুকু বুকের ভেতর নিয়ে সে ফিরতি পথ ধরল।
বাসে ওঠার পর অনেকক্ষণ পরে ফোন হাতে নিয়ে দেখল পৃথার একটি মেসেজ এসেছে।
"আমি আজ বাসায় চলে যাচ্ছি। পরীক্ষাগুলো ভালো হয়নি। রাত আটটার বাস।"
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, সময় অনেক পেরিয়ে গেছে।
সে শুধু একটি বিষণ্ন ইমোজি পাঠাল।
তারপর নিজের পরবর্তী পরীক্ষায় আর অংশ না নিয়েই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
চলবে...