প্রথম দেখা
মাঝখানে কেটে গেল দুই বছর। এই দীর্ঘ সময়ে চিঠি, বই আর ছোট ছোট উপহার আদান-প্রদান হয়েছে। মেসেজের সীমা পেরিয়ে মাঝেমধ্যে অডিও কলেও কথা হয়েছে। অথচ সামনাসামনি দেখা—সেটা এখনো হয়নি।
কলেজ জীবন শেষ। দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ঠিক সেই সময়ই ভাগ্য যেন তাদের জন্য একটি দিন আলাদা করে রেখেছিল। দেশের দক্ষিণের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজনেরই ভর্তি পরীক্ষা পড়ল।
শ্রাবণের কাছে পরীক্ষার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল অন্য একটি বিষয়—দুই বছরের অপেক্ষার পর পৃথাকে প্রথমবার দেখার মুহূর্ত।
পরীক্ষার আগের রাতে বই খুলেও পড়ায় মন বসেনি তার। বারবার মনে হয়েছে, আগামীকাল সত্যিই কি দেখা হবে?
পরদিন দুজনের পরীক্ষা হয় দুই ভিন্ন ভবনে। কোনোমতে পরীক্ষা শেষ করে শ্রাবণ দাঁড়িয়ে রইল পৃথার ভবনের সামনে।
চারদিকে মানুষের ভিড়। অভিভাবক, পরীক্ষার্থী, বন্ধু—সবাই নিজের মানুষটিকে খুঁজে ফিরছে। সেই জনসমুদ্রের মাঝেও শ্রাবণের চোখ শুধু একজনকেই খুঁজছিল।
অন্যদিকে পৃথাও ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভাবছিল, এত মানুষের মধ্যে কি আদৌ শ্রাবণকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?
হঠাৎ পিছন থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—
শ্রাবণ: "পৃথা!"
চমকে উঠে পিছনে তাকাতেই পৃথা থমকে গেল। ছবির মানুষটা আজ বাস্তবে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।
পৃথা: "তুমি!"
শ্রাবণ: "তুমিই তো বলেছিলে, একদিন বাস্তব হয়ে যাব!"
পৃথা: "হ্যাঁ... বাস্তব হয়েই গেলে।"
দুজনেই কিছুক্ষণ শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন দুই বছরের সমস্ত অপেক্ষা সেই নীরবতায় গলে যাচ্ছে।
শ্রাবণ হেসে বলল—
শ্রাবণ: "চলো, শাটল ট্রেনে উঠে শহরটা একটু ঘুরে দেখি।"
পৃথা সম্মতি জানাল।
শাটল ট্রেন তখন মানুষে ঠাসা। দাঁড়ানোর মতো জায়গাও নেই। অনেক কষ্টে দুজন পাশাপাশি দাঁড়ানোর সামান্য জায়গা পেল।
শ্রাবণ: "এভাবে ট্রেনে যাওয়া যায় নাকি?"
পৃথা: "এটাই আসল অভিজ্ঞতা!"
ট্রেন ছাড়তেই হঠাৎ প্রবল ঝাঁকুনি খেল। ভারসাম্য হারিয়ে পৃথা একেবারে শ্রাবণের গায়ের ওপর এসে পড়ল।
পৃথা: "সরি!"
শ্রাবণ: "কিছু হয়নি... শক্ত করে ধরো।"
পৃথা হাতল আঁকড়ে ধরল। বাইরে দ্রুত পেছনে ছুটে চলেছে শহর। ভেতরে দুজনের নীরবতা যেন হাজারটা কথার চেয়েও গভীর।
ফুচকা, ফালুদা আর এক মুঠো অনুভূতি
শহরের অলিগলি পেরিয়ে তারা পৌঁছাল একটি ছোট্ট স্ন্যাকস স্টোরে। আশপাশে তরুণ-তরুণীদের ভিড়। বিকেলের আলোয় জমে উঠেছে আড্ডা।
শ্রাবণ: "কি খাবে?"
পৃথা: "তুমি যা খাওয়াবে।"
শ্রাবণ: "তাহলে দুই প্লেট ফুচকা। একটা নরমাল, একটা বোম্বাই ঝাল!"
পৃথা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
পৃথা: "বোম্বাই ঝাল আবার কেমন?"
শ্রাবণ: "খেয়েই বুঝবে!"
ফুচকা মুখে দিয়েই পৃথার চোখ বড় হয়ে গেল।
পৃথা: "শ্রাবণ! এটা তো আগুন!"
শ্রাবণ হেসে উঠল।
শ্রাবণ: "আমি তো জোর করিনি!"
পৃথা দ্রুত পানি খেল। তারপর দোকানদারকে ডেকে বলল—
পৃথা: "এক কাপ ফালুদা দিন... আর দুইটা চামচ।"
শ্রাবণ অবাক হয়ে তাকাল।
শ্রাবণ: "দুইটা চামচ কেন?"
পৃথা: "আমরা তো বন্ধু... ভাগ করে খেতে পারব না?"
শ্রাবণ কিছু বলল না। শুধু মনে হলো, এই ছোট্ট মুহূর্তটাও যেন জীবনের বড় কোনো স্মৃতি হয়ে থাকবে।
অসম্পূর্ণ দুপুর
দুপুরের রোদ তখনও তীব্র। খাবার শেষ করে তারা ধীরে ধীরে রাস্তা ধরে হাঁটছিল।
হঠাৎ পৃথা চারপাশে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল—
পৃথা: "শ্রাবণ... এবার যাই? দাদার অফিস কাছেই। দেখে ফেললে বাসায় বলে দেবে।"
শ্রাবণ হেসে বলল—
শ্রাবণ: "এত ভয় পাও কেন?"
পৃথা গম্ভীর হয়ে গেল।
পৃথা: "তুমি বুঝবে না। বাসায় জানাজানি হলে অনেক ঝামেলা হবে।"
শ্রাবণ বুঝতে পারল, সে সত্যিই ভয় পাচ্ছে।
রাস্তার মোড়ে এসে দুজন থামল।
পৃথা: "তুমি বাসে ওঠো। আমি এখান থেকে রিকশায় চলে যাব।"
শ্রাবণের খুব ইচ্ছে করছিল বলতে— "আরেকটু থাকো..." কিন্তু সে বলল না।
বাস এসে গেল। শ্রাবণ উঠে জানালার পাশে বসল। বাস ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে গেল। তারপর শহরের ভিড়ে মিলিয়ে গেল।
শ্রাবণ জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
এই দুপুরটা হয়তো আরও কিছুক্ষণ স্থায়ী হতে পারত...
চলবে...