দূরত্বের দ্রুত যাত্রা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দূরত্বটা যেন আরও স্পষ্ট হতে লাগল।
পৃথা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন জীবন, ক্লাস, পরীক্ষা আর বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দিনের পর দিন কেটে যেত, কিন্তু আগের মতো আর নিয়মিত কথা হতো না।
শ্রাবণের কাছে এই পরিবর্তনটা ছিল অসহনীয়। সে বুঝতে পারছিল, মানুষ ব্যস্ত হয়, জীবন বদলায়—তবুও কোথাও যেন একটা শূন্যতা তাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করে চলেছে।
অনেক রাত পর্যন্ত ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকত সে। কখনো একটি মেসেজ লিখে আবার মুছে ফেলত। কখনো শুধু পৃথার প্রোফাইলে গিয়ে নতুন পোস্ট আছে কি না দেখত।
ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে ভুলে থাকার জন্য সিগারেটের পাশাপাশি নেশার দিকেও ঝুঁকে পড়তে শুরু করল।
মাঝেমধ্যে গভীর রাতে ফোন করত পৃথাকে।
শ্রাবণ: "আমাদের বন্ধুত্বটা... শেষ হয়ে যাচ্ছে না তো?"
পৃথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত—
পৃথা: "না। কিন্তু আমি সত্যিই অনেক ব্যস্ত। সবসময় আগের মতো সময় দিতে পারি না।"
শ্রাবণ জানত, কথাটা সত্যি। তবুও মন মানতে চাইত না।
নিজেকে সামলাতে না পেরে মাঝেমধ্যেই সে অজুহাত খুঁজে পৃথার শহরে চলে যেত।
কখনো রিকশায় ঘুরত, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে হাঁটত, কখনো আবার সেই পুরোনো মন্দিরে গিয়ে বসে থাকত।
যে শহরে পৃথা ছিল, সেই শহরটাকেই নিজের কাছে আপন মনে হতো তার।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথার দিক থেকে যোগাযোগ আরও কমে গেল।
শ্রাবণ বুঝতে পারছিল, আর নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
একদিন গভীর রাতে সে অনেক সাহস সঞ্চয় করে একটি দীর্ঘ মেসেজ লিখল।
শ্রাবণ: "একটা কথা অনেকদিন ধরে বলতে চাইছি। ভয় ছিল, বললে হয়তো তোমাকে হারাব। কিন্তু আর নিজের কাছে লুকিয়ে রাখতে পারছি না। আমি তোমাকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখি না... আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।"
মেসেজটি পাঠানোর পর তার হাত কাঁপছিল।
কয়েক মিনিট... তারপর কয়েক ঘণ্টা...
কোনো উত্তর এলো না।
পরদিন বিকেলে পৃথার রিপ্লাই এল।
পৃথা: "এই বিষয়ে মেসেজে কিছু বলতে চাই না। দেখা হলে কথা বলব।"
সেদিনের পর থেকে শ্রাবণের অপেক্ষা যেন আরও বেড়ে গেল।
কয়েক সপ্তাহ পর দুজনের আবার দেখা হলো।
একটি নিরিবিলি জায়গায় বসে ছিল তারা। চারপাশে নীরবতা।
অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
অবশেষে পৃথা নীরবতা ভাঙল।
পৃথা: "তুমি আমার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু আমি চাই না আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে কোনো স্বার্থ এসে দাঁড়াক।"
শ্রাবণ চুপচাপ শুনছিল।
পৃথা: "ভালোবাসা যদি বন্ধুত্বকে ভেঙে দেয়, তাহলে সেই ভালোবাসা আমি চাই না। আমি আমাদের সম্পর্কটা যেমন আছে, তেমনই রাখতে চাই।"
শ্রাবণের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে জানত, পৃথা তাকে অপমান করেনি। বরং নিজের অবস্থানটা সৎভাবেই জানিয়েছে।
তবুও সত্যিটা মেনে নেওয়া তার জন্য সহজ ছিল না।
ফেরার পথে দুজন পাশাপাশি হাঁটলেও, তাদের মাঝখানে যেন কয়েক হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
সেদিনের পর শ্রাবণ বুঝে গেল—কিছু ভালোবাসা পাওয়া যায় না, শুধু বয়ে বেড়াতে হয়।
চলবে...