বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সূচনা
দীর্ঘ ছয় মাস ধরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েও দুজনের কারও ভাগ্য খুলছিল না। প্রতিটি ফল প্রকাশের দিন যেন নতুন করে হতাশা নিয়ে আসত।
পৃথা ভীষণ ভেঙে পড়েছিল। এত পরিশ্রমের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় নিজের ওপরই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিল ধীরে ধীরে।
অন্যদিকে শ্রাবণের দুশ্চিন্তা ছিল ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তার কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল পৃথার সঙ্গে যোগাযোগটা টিকে থাকা।
পৃথা ধীরে ধীরে ফেসবুকে আসা কমিয়ে দিল। মেসেজের উত্তর দিত না, ফোনও ধরত না।
হঠাৎ করে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রাবণ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল। একাকীত্ব ভুলে থাকার জন্য বাড়িয়ে দিল সিগারেট খাওয়ার মাত্রা।
একদিন অনেকদিন পর হঠাৎ একটি মেসেজ ভেসে উঠল।
পৃথা: "আচ্ছা... আমার যদি কোথাও চান্স না হয়, তুমি কি আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেবে?"
মেসেজটি পড়ে শ্রাবণের বুকটা হু হু করে উঠল।
সে বুঝতে পারল, পৃথাও ভেতরে ভেতরে ভীষণ কষ্টে আছে।
শ্রাবণ: "তুমি আমার কাছে যেমন আছো, তেমনই পরিপূর্ণ। পুরো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।"
কিছুক্ষণ পর পৃথা শুধু একটি বিষণ্ন ইমোজি পাঠাল।
তারপর আবার দীর্ঘ নীরবতা।
কয়েক সপ্তাহ পর হঠাৎ ফেসবুকে একটি পোস্ট চোখে পড়ল।
পৃথা দেশের একটি স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
খবরটি দেখেই আনন্দে ভরে উঠল শ্রাবণের মন।
সে সঙ্গে সঙ্গে লিখল—
শ্রাবণ: "অভিনন্দন, পাবলিকিয়ান! বলেছিলাম না, তুমি পারবে?"
দুই দিন পর উত্তর এল—
পৃথা: "ধন্যবাদ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন... কোনোমতে চলছে। অনেক ব্যস্ততা।"
এরপর আবার ধীরে ধীরে কথাবার্তা শুরু হলো।
কিছুদিনের মধ্যেই শ্রাবণও দেশের আরেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল।
কিন্তু দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচশো কিলোমিটার।
যোগাযোগ ছিল, কিন্তু আগের মতো আর প্রতিদিনের গল্পগুলো ফিরে এল না।
এক বছর পর দেখা
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বছর কেটে গেছে।
শ্রাবণ এখনো পৃথাকে ভুলতে পারেনি।
অন্যদিকে নতুন বন্ধু, নতুন ক্যাম্পাস আর একাডেমিক ব্যস্ততায় পৃথার দিনগুলো দ্রুত কেটে যাচ্ছিল।
সে চাইলেও আগের মতো সময় দিতে পারত না।
পরের বছর আবার ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম এলো।
শ্রাবণ ইচ্ছে করেই পৃথার বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
আর অনেক অনুরোধের পর পৃথাও শ্রাবণের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে রাজি হলো।
পরীক্ষা শেষে দুজনে শহর ঘুরতে বের হলো।
প্রাচীন একটি মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল তারা।
বাবার মৃত্যুর পর থেকে শ্রাবণের মনে ঈশ্বরের প্রতি এক নীরব অভিমান জমে ছিল। তাই বহুদিন কোনো মন্দিরে প্রবেশ করেনি সে।
কিন্তু পৃথার জোরাজুরিতে এবার আর না করতে পারল না।
পৃথা দুই হাত জোড় করে চোখ বন্ধ করল।
সে কী প্রার্থনা করেছিল, তা শ্রাবণ জানত না।
তবে নিজের প্রার্থনায় শ্রাবণ শুধু একজন মানুষের নামই উচ্চারণ করেছিল— পৃথা।
মন্দির থেকে বেরিয়ে তারা বাসে উঠল।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বাসের ভেতরে মৃদু আলো।
জানালার বাইরে অন্ধকার শহর পেছনে ছুটে যাচ্ছে।
আর শ্রাবণ চুপচাপ তাকিয়ে আছে পৃথার মুখের দিকে।
রাস্তার আলোর ক্ষণিক ঝলকে পৃথার মুখটা কখনো স্পষ্ট হচ্ছে, কখনো আবার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে।
সেই মুহূর্তে শ্রাবণের মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি হয়তো তার সামনেই বসে আছে।
বাস গন্তব্যে পৌঁছালে দুজন আবার বিদায় নিল।
কিন্তু বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে দুজনের মাঝের দূরত্বটাও যেন আবার কয়েকশো কিলোমিটার বেড়ে গেল।
চলবে...