অপেক্ষার সূর্যোদয়
পরিচয়ের সূচনা
সেদিন ছিল বর্ষার এক বিকেল। মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু ফল প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে অনেকদিন। বাইরে বের হওয়া নিষেধ। পুরো দেশজুড়ে কারফিউ। যানবাহন, স্কুল, অফিস, বাজার—সবকিছু বন্ধ। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার উপায় নেই। সারাদিন বাসায় বসে থেকে একঘেয়েমি পেয়ে বসেছিল তাকে।
করোনার কারণে পুরো বিশ্বই যেন থমকে গেছে।
শ্রাবণ সারাদিন বই পড়ে, লেখালেখি করে, মাঝে মাঝে ফেসবুকে ঘোরাঘুরি করে। লেখালেখির নেশাটা তার ছোটবেলা থেকেই ছিল। গল্প, কবিতা, ভাবনা—সবকিছুই তার কাছে অন্যরকম ভালো লাগার জায়গা। কিন্তু সমস্যা একটাই, তার কোনো পাঠক নেই। সে যখনই নিজের লেখা পোস্ট করে, লাইক-কমেন্টের সংখ্যাটা থাকে হাতেগোনা।
সেদিন সন্ধ্যার দিকে সে ফেসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপে স্ক্রোল করছিল। হঠাৎ করেই একটা প্রোফাইল তার দৃষ্টি কাড়ল। মেয়েটির নাম পৃথা। গ্রুপে শ্রাবণের করা একটি মজার পোস্টে কেউ তাকে মেনশন দিয়েছে।
শ্রাবণ পৃথার প্রোফাইল ঘেঁটে দেখল, সে মাঝেমধ্যে গল্প লিখে। কিছু ছবি পোস্ট করে, আর মায়াবী ক্যাপশন দেয়। মেয়েটা যে চঞ্চল প্রকৃতির, সেটা বুঝতে দেরি হলো না।
হঠাৎ করেই কী এক অজানা কারণে শ্রাবণ পৃথার ইনবক্সে নক দিল। নিজের একটি লেখার লিংক পাঠাল। কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই এলো—
পৃথা: "তুমি কে?"
একটা হাসি চলে এলো শ্রাবণের মুখে। এটাই ছিল তাদের প্রথম কথা বলা।
সেদিনের পর থেকে নিয়মিত কথা হতে লাগল। শ্রাবণ নিজের লেখাগুলো পৃথার সঙ্গে শেয়ার করত, তার প্রতিক্রিয়া শুনত। পৃথা কখনো খুশি হয়ে প্রশংসা করত, কখনো নির্মম সমালোচনা করত।
পৃথা: "এই গল্পটা একদমই বাস্তবধর্মী হয়নি!"
পৃথা: "তুমি এত বিরহের কাহিনি কেন লেখো? বিচ্ছেদকেই কেন তোমার গল্পের পুঁজি বানিয়েছ?"
পৃথা: "তোমার লেখাগুলো সুন্দর। কিন্তু জানো? ঠিকভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারলে একদিন অনেক বড় লেখক হতে পারবে।"
পৃথার কথা শুনে শ্রাবণ কখনো রাগ করত না। বরং লেখনীতে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করত। মাঝে মাঝে এসব প্রশ্ন শুনে একাকী হাসত।
আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে একটা অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হলো।
কিন্তু তখনও শ্রাবণ জানত না—এই বন্ধুত্ব একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতিতে রূপ নেবে।
অনিয়মিত কথাবার্তা
ওদের মধ্যে মেসেজেই কথাবার্তা হতো। আর কথোপকথনের বিষয় ছিল সাহিত্য।
শ্রাবণ মেসেজ পাঠানোর পর সবসময় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো পৃথার রিপ্লাই পাওয়ার জন্য। বারবার ফোনের স্ক্রিন অন করে দেখত, উত্তর এসেছে কি না। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত, কখনো রাত গড়িয়ে সকাল হতো।
তবুও শ্রাবণ হতাশ হতো না। সে জানত, লেখকের কাজ অপেক্ষা করা নয়—লিখে যাওয়া।
একদিন পৃথার টাইমলাইনে কিছু কবিতা দেখে সে ইনবক্সে লিখল—
শ্রাবণ: "আপনি তো দারুণ লেখালেখি করেন। এটা কি পার্টটাইম, নাকি ফুলটাইম?"
দুই দিন পর সকালে রিপ্লাই এলো—
পৃথা: "হুম, লিখি... কখনো কখনো। তবে কবিতা লিখতে গেলে মনে হয়, শব্দগুলো আমায় বিশ্বাস করে না। তোমার কমেন্টটা ভালো লেগেছে। সময়ই সবকিছু ঠিক করে দেয়, তাই না?"
শ্রাবণ একটু অবাক হলো। সে ভাবেনি, পৃথা এত আন্তরিকভাবে উত্তর দেবে।
শ্রাবণ: "হ্যাঁ, সময়ই সবকিছু ঠিক করে দেয়। তবে আমরা যারা লিখি, তারা কি সময়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিই? নাকি পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী গল্প বদলাই?"
পৃথা: "ভালো প্রশ্ন! কিন্তু গল্পের চরিত্রগুলো কি আমাদের কথা শোনে?"
এভাবেই ধীরে ধীরে সাহিত্য থেকে শুরু হওয়া আলাপ ছড়িয়ে পড়ল সিনেমা, সমাজ, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের দিকে।
চলবে...